অহল্যা
- প্রণব রায়চৌধুরী
1.
বয়ঃসন্ধি হতে না হতেই স্বচ্ছ সরোবরে ফুটে ওঠা পদ্মের মতো নিষ্পাপ লাবণ্যস্বরূপ ত্রুটিবিহীন শোভা প্রতিম তরুণীটির মাল্য বিনিময় হয়ে গেলো এমন একজন বৃদ্ধের সাথে, যিনি মহাজ্ঞানী, ত্রিকালদর্শী মানব শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিখ্যাত ǀ যিনি মেয়েটির শৈশব থেকে নিয়ে তার রজো দর্শনারম্ভ অবধী তত্ত্বাবধান কার্যটি অতি নিষ্ঠার সাথে সমাপন করে অতিরিক্ত প্রীতির পাত্র হয়ে উঠেছিলেন মেয়েটির সৃষ্টিকর্তা পিতার ǀ পুরস্কার স্বরূপ অবিরল সৌন্দর্য্যের অধিকারিণী তন্বীর পানি প্রাপ্তি ǀ বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা ! এ ব্যাপারে বিবাহযোগ্যা কন্যাটির সম্মতির প্রয়োজনটুকু পর্যন্ত জরুরি মনে করেন নি সেদিন কেউ ǀ শুধু তাই নয়, সদ্য বিকসিত যৌবনের কৌতূহলে সখীদের কাছে শোনা স্বামী সন্নিধানে একান্তে নব পরিণীতা বধূর কি কি ধরণের সুখ প্রাপ্তি হয়ে থাকে সেই ঔৎসুক্য নিব্বৃতির প্রত্যাশা প্রত্যাখ্যান হতে থাকে বার বার ǀ আজ কন্যা রজঃস্বলা তো কাল স্বামীর ব্রত পালন ǀ পরের দিন গ্রহ সন্নিবেশ প্রতিকূল নয়! এমনি ভাবে দিনপাত হতে হতে পরিশেষে ভবিতব্য মেয়েটির জীবনে অবিলম্বে ঘনিয়ে আনলো এক নিদারুন পরিণাম - প্রেমিকের বেশে, বিবাহ বহির্ভূত পুরুষের সঙ্গ সুখের আবেশে ǀ ফল স্বরূপ সিদ্ধবাক স্বামী প্রদত্ত অমোঘ অভিসম্পাত ও নির্বাসন ǀ দেবরাজ ইন্দ্র ও গৌতম মুনি পত্নী অহল্যার অবৈধ সহবাস সেকালের সমাজকে তুমুলভাবে নাড়া দিয়েছিলো ঠিক সেইভাবে যেভাবে এলোকেশী-মোহন্ত সংবাদ আলোড়িত করেছিল উনিশ শতকের শিক্ষিত বঙ্গসমাজকে ǀ অমর্যাদার আত্ম গ্লানিতে জর্জরিত নবীনচন্দ্র সেদিন স্বহস্তে ধর্ম পত্নীর শিরোচ্ছেদ করে প্রশাসনের হাতে স্বেচ্ছাসমর্পণ করেন এবং সাজা প্রাপ্ত হন ǀ গৌতম মুনির সামাজিক মর্যাদা অপেক্ষাকৃত ভাবে অনেক গুন বেশি ছিল নিশ্চিত ǀ যে কারণে অহল্যার দাম্পত্য রীতি উল্লঙ্ঘনের দণ্ডও ছিল তুলনা মূলক ভাবে অনেক বেশি নিদারুন ǀ
ঘটনাটি ঘটেছিলো এমন একটা সময়ে যে সময়টার কোনো গাছ কিংবা পাথর নেই ǀ অর্থাৎ কিনা ঠিক কোন সময় যে এ সব হয়েছিল তার কোনো সঠিক হিসাব নেই ǀ একটু পরিষ্কার ভাবে বলা যেতে পারে যে ঋগবেদ, যা কিনা সর্ব্বসম্মত ভাবে হিন্দু ধর্মের সর্ব্বাধিক প্রাচীন নথি, সেটা যদি পাঁচ হাজার বছর আগে লিপি বদ্ধ হয়েছিল বলে ধরে নেই, তবে এ ঘটনা তারও অন্তত পাঁচ কিংবা ছয় হাজার বছর আগের সময়কার, যখন সূর্য বংশীয় রাজকুমার শ্রী রাম চন্দ্র পদ স্পর্শ করে পাষান হয়ে যাওয়া অহল্যাকে উদ্ধার করে সন্ত সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ǀ অর্থাৎ গৌতম-অহল্যা উপাখ্যান যে আজ থেকে কম পক্ষে এগারো কিংবা বারো হাজার বছর আগেকার কথা তাতে কোনো সন্দেহ নেই ǀ একথাও অবশ্য জানিয়ে রাখা ভালো যে গৌতম মুনি সত্য যুগের অবসান ঘটিয়ে ত্রেতা যুগের আরম্ভ করিয়েছিলেন অহল্যার দ্রুত মুক্তির উদ্দেশ্যে - পঞ্চাঙ্গ অনুসারে হিসেবে করলে সেটা কম করে আটতিরিশ লক্ষ বৎসরের কম হবে না ǀ তবে সেকালের বর্ষ পঞ্জির মাত্রা ঠিক কি ছিল, সে বিষয়ে একটা আলোচনার অবকাশ থেকেই যায় ǀ
একটু মনে মনে চিন্তা করে নেওয়া যাক তখনকার ভারতবর্ষের ছবিটা ǀ বেদ তখনও লেখা হয়নি ǀ শ্রুতি আর স্মৃতি হিসেবেই বর্ত্তমান শুধু ǀ সমগ্র ভারত ভূখণ্ডে সর্ব্বাধিক অগ্রগণ্য একটাই ধর্ম - একাধিক ঈশ্বরবাদী সনাতনী, যেটা হয়তো বা মানুষের বিবর্তনের সাথে সাথে কয়েক মিলিয়ন বৎসর ধরে ক্রমাগত ভাবে বিবর্তিত হতে হতে ইন্দ্র-বরুন-অগ্নি-গড়ুর ইত্যাদি কয়েকটি মাত্র দেবতার উপাসনায় এসে দাঁড়িয়েছিল ǀ মধ্য এশিয়া থেকে হিন্দুকুশ পর্বতের পথ হয়ে আসা সংস্কৃত ভাষাভাষী আর্য সম্প্রদায়ের তুলনামূলক ভাবে অধিক সংগঠিত ও জোরালো নব্য ধর্মের প্রভাবে অনার্য ধৰ্ম আচার গুলো ক্রমশই পিছু হঠে যায় দক্ষিন দিশার উদ্দেশ্যে ǀ ব্যতিক্রম শুধুমাত্র প্রাক-বৈদিক দেবাদিদেব তন্ত্র চূড়ামনি যোগী সম্রাট মহাদেব যার তুমুল প্রভাব বিজেতা শ্রেণীর আপাত উচ্চ ভাবনাসম্পন্ন বলিষ্ঠ মতবাদও অস্বীকার করতে পারেনি ǀ এই রকম একটা পরিস্থিতির মাঝখানে ইন্দ্র-বরুন-গড়ুর-অগ্নিরা ধীরে ধীরে গুরুত্ত্ব হারিয়ে পশ্চাতপটে বিলীন হয়ে গেলেন ǀ
2
অহল্যা - সেকন্ড পার্ট
এর আগে পর্যন্ত সর্বশক্তিমান ইন্দ্রই ছিলেন যোদ্ধাশ্রেণীর মুখ্য উপাস্য দেবতা যিনি কিনা দধীচির হাড় দিয়ে তৈরী বজ্রের সাহায্যে পৃথিবীর সর্বশেষ ড্রাগন বৃত্ত্বাসুরকে বধ করে স্বমহিমায় বিরাজ করছিলেন ǀ সেই সর্ব্ব পূজ্য ইন্দ্রকেও শুধু মাত্র দেব রাজ উপাধি নিয়েই সন্তুষ্ট হতে হলো ǀ এর পর তান্ত্রিক উপাসনার কেন্দ্রবিন্দু রুদ্রা রূপিণী মা কালীর স্থান অধিগ্রহণ করে নিলেন বৈদিক দেবী মাতা পার্বতী ǀ অতীতের ব্যাপক প্রচলিত প্রকৃতি পূজা ও তান্ত্রিক উপাসনার প্রথা গৌরবচ্যুত হয়ে সর্ব্বজনীন স্বীকৃতির অভাবে অকিঞ্চিৎকর ধর্মাচরণে রূপান্তরিত হয়ে গেলো ǀ ভীমবেতকার গুহায় পাওয়া শিল্পশৈলীতে বাবা মহাদেবের পশুপতি প্রতিরূপ লক্ষ্য করা গেছে... এ অঞ্চলের আদিমানবরা যে তিরিশ হাজার বৎসর আগে পালিওলিথিক যুগে বসতি করেছিল, সে ব্যাপারে রাশি রাশি তত্ত্ব, তথ্য ও অনুমান গুগল করলেই পাওয়া যাবে ǀ সে হিসেবে বলা যেতে পারে যে আমাদের শ্মশানবাসী জামাতা বাবাজির বয়েস নিদেন পক্ষে তিরিশ বত্তিরিশ হাজার বছরের কম নয় ǀ ইদানিং অবশ্য পাশ্চত্যের কিছু চিন্তাশীল মানুষ সিন্ধু সভ্যতার হস্তলিপির রহস্য উদ্ধারের কাজে বেশ খানিক কাজ কর্ম করার ফলে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস সম্বন্ধে ধারণা অনেকটাই পাল্টে যাবার সম্ভাবনা বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে ǀ এদেরই নব্য মতবাদ অনুযায়ী আর্য সম্প্রদায় ৬০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দেও ভারত ভূখণ্ডে উপস্থিত ছিল আর হারাপ্পা মহেঞ্জোদারোই নাকি তাদেরই অবদান ǀ এ সমস্ত তত্ত্ব সে সময়কার সিলমোহর ইত্যাদির সংকেতলিপির পাঠোদ্ধারের প্রচেষ্টায় অনুমান ভিত্তিক মাত্র ǀ
বৃত্ত্বাসুরের গল্পটা একটা রূপক ǀ আসল ঘটনাটা ঘটেছিলো আজ থেকে প্রায় চৌদ্দ হাজার বছর আগে পৃথিবীর শেষতম তুষার যুগের অন্তিম ক্ষণে ǀ ইন্দ্র বজ্রাঘাতে (এক্সপ্লোশন না অগ্নি সংযোগ সেটা আন্দাজ করা দুস্কর) গ্লেসিয়ার (যেটা এখানে বৃত্ত্বাসুর নামের ড্রাগন পড়তে হবে) অপসারণ করে অবরুদ্ধ জলরাশিকে বিমুক্ত করে দিয়েছিলেন ǀ ঋগবেদের চতুর্থ মন্ডলে বামদেব ইন্দ্রের জন্মের যে বৃত্তান্ত লিখেছেন সেটা বেশ রোমহর্ষক ǀ শোনা যায় ইন্দ্রের ভ্রুন নাকি রক্ষা করা হয়েছিল বহু মাস ধরে পৃথিবীর গর্ভে ǀ এরপর কুশভা নদীতে পরিপূর্ণতা পায় সেটা ǀ জন্মের আগে থেকেই ইন্দ্র তার বৃত্ত্রাসুর সম্পর্কিত কার্যসূচীর কথা জানতেন আর সেটা সম্পন্ন করেওছিলেন জন্মাবার সাথে সাথে ǀ জন্মের আগে তিনি এও ঠিক করে নিয়েছিলেন যে গতানুগতিক ভাবে যন্ত্রণাদায়ক প্রসবের পথ তিনি অনুসরণ করবেন না, তাই মাতৃগর্ভ বিদীর্ন করে বেরিয়েছিলেন মায়ের শরীরের পাশ দিক থেকে ǀ অমঙ্গল বিচার করে মা জননী তাকে লুকিয়ে ফেললেন আর পিতা সহধর্মিনীর দুরবস্থা দেখে সহ্য করতে না পেরে মাটিতে আছাড় মেরে তার দাঁতগুলো টুকরো টুকরো করে ভেঙে দিলেন ǀ কিন্তু এসব সত্ত্বেও তাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় নি ǀ জন্ম মাত্রেই অপরিসীম শক্তির অধিকারী ইন্দ্র পিতার হত্যা করে মৃতপ্রায় মায়ের দিকে শেষ বারের মতো এক পলক দৃষ্টিপাত করে এগিয়ে চললেন ভবিতব্যের পথে ǀ পরিত্যক্ত অনাথ দেব ǀ যে কার্য সম্পন্ন করতে তার ধরা ধামে জন্মগ্রহন, তারই উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললেন ǀ সেদিন এক মাত্র শ্রী বিষ্ণু ছাড়া কেউ তার সহমর্মী ছিল না ǀ তাকে উদ্দেশ্য করে সেদিন তিনি বলেছিলেন, " হে মিত্র, সম্মুখপানে এগিয়ে চলো" ǀ এই একটা কথা থেকেই তার জীবনের মূল মন্ত্রটি আন্দাজ করা যাবে - পিছনে না তাকিয়ে সামনে এগিয়ে চলাটাই জীবনের আরেক নাম ! এরপর বৃত্রাসুর বধ ও বদ্ধ জলরাশির বিমুক্তিকরণ, মানব কল্যাণার্থে ǀ
3
হিন্দুশাস্ত্রে ইন্দ্রের চরিত্রটি অঙ্কন করা হয়েছে হিতৈষী, জনকল্যানকারী, শান্তি সমৃদ্ধির রক্ষাকর্তা হিসেবে ǀ প্রাক বৈদিক ভারতবর্ষে যোদ্ধারা দেবরাজ ইন্দ্রের পূজা করে তবেই অস্ত্র হাতে নিত ǀ পরম বিক্রমশালী নৃপতি সুদাসের বিরুদ্ধে দশ রাজার সম্মিলিত শক্তির সংগ্রাম, যেটা দশরাজ্ন নামে উল্লেখ করা আছে ঋগবেদে, তাতে দেবরাজ ইন্দ্র পুরু অনু দ্রুহ্যু ইত্যাদি উপজাতির রাজাদের সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ সহায়তা করেছিলেন ǀ দেবগুরু বৃহস্পতির গো-ধন লুঠে নিয়ে বন্দি করে রাখা হিংস্র পণি প্রজাতি, যাদের ঋগবেদে রাক্ষস বলে বর্ণনা করা হয়েছে তাদের আক্রমণ করে গো-পাল উদ্ধার করে আনেন ইন্দ্র ǀ সে সময়ের কৃষিজীবী পশুপালক সভ্যতায় গবাদি পশুর গুরুত্ত্ব ও কদর ছিল অপরিসীম ǀ সম্পূর্ণ দেবলোকের আধিপত্য হস্তগত করেছিলেন তিনি একান্তই নিজের শৌর্য বীর্যের সহায়ে ǀ অসীম পুরুষালি তেজের অধিকারী ইন্দ্রের সোম রসের প্রতি অত্যধিক অনুরাগ বিখ্যাত ছিল যেটা আসলে তার শক্তি বহুগুন বাড়িয়ে দিত বলা হয় ǀ এই প্রকার মানুষটি অথবা দেব চাইলে কি আর অহল্যার অপহরণ করতে পারতেন না ? কিন্তু সেটা তিনি করেন নি ǀ অহল্যাও গুণমুগ্ধ প্রেমিকের প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে অনুগ্রহ করেছিলেন দেবীসুলভ প্রশ্রয়ে ǀ
আজকাল খবরের কাগজ খুললেই নিত্য কিছু না কিছু খবর চোখে পরেই যায় নারী অপহরণ, গন ধর্ষণ আর হত্যার ǀ ধর্ষণকারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের পোষণ পুষ্ট ǀ এই সমস্ত অসামাজিক গুন্ডারা পড়ে পাওয়া ক্ষমতার বলে যথেচ্ছাচার করে বেড়ায় আর ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায় সামাজিক মূল্যবোধ ǀ অনেককে তো এমনটাও বলতে শুনি - স্বল্পবসনা আধুনিকা নারী নাকি নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনে ǀ অথচ প্রাচীন ভারতে নারী শরীরে বস্ত্র বাহুল্য না থাকা সত্ত্বেও এধরণের সামাজিক বিপর্যয়ের কথা খুব বেশি শোনা যায় নি ǀ পাশ্চাত্য মূল্যবোধের অর্ধমূল্য গলায় ঢেলে নিজেদের অতীত ভুলে আমরা আজ মূল্যশূন্য হয়ে আছি ǀ
আমাদের চির পরিচিত রামায়ণে অহল্যা চরিত্রটির বর্ণনা করা হয়েছে ব্যাভিচারের দৃষ্টান্ত হিসেবে ǀ অথচ তার জীবনের পশ্চাৎপট খতিয়ে দেখলে আশ্চর্য লাগে এই ভেবে যে গৌতম মুনির স্ত্রী হিসেবে প্রভূত সামাজিক গৌরবের অধিষ্ঠাত্রী হওয়া সত্ত্বেও এরকম অপ্রত্যাশিত পন্থা অবলম্বন তিনি কেন করলেন! যদি গর্হিত অপরাধ বলে ধরেও নেই, তবে সেযুগে পুরুষদের মধ্যেও ব্যাভিচার জাতীয় কার্যকলাপ কম কিছু ছিল না ǀ উদাহরণ হিসেবে লংকেশ্বর রাবনের কথা বললেই যথেষ্ট হবে ǀ বেদজ্ঞ, শিবের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ভক্ত, সিদ্ধ চিকিৎসার প্রামাণ্য জ্ঞানী, সংগীতজ্ঞ, সুবিবেচক প্রজাপালক ও সমর বিজ্ঞানে কিম্বদন্তিস্বরূপ জ্ঞানের অধিকারী রাবনের একটিমাত্র দোষ তার ধ্বংস ডেকে এনেছিল ǀ রূপসী নারী মাত্রের উপর তারই প্রথম অধিকার এই অহংকার শ্রী রামের হাতে তার মৃত্যুর মুখ্য কারণ ǀ রামায়ণ সম্বন্ধে একটি প্রচলিত বিশ্বাসের কথা এখানে উল্লেখ না করে পারছি না যদিও অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে ǀ বলা হয় যে এক বিলিয়ন শ্লোকের মূল রামায়ণের রচয়িতা ছিলেন স্বয়ম ব্রহ্মা, যিনি সেটি নিজের হাতে প্রদান করেছিলেন নারদকে ǀ নারদ রচনাটি অর্পণ করেন মহাদেবকে ǀ বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরানে বলা হয়েছে যে স্বয়ম ব্রহ্মার প্রতিরূপ হিসেবে বাল্মীকি ত্রেতা যুগে অবতীর্ণ হয়ে রামায়ণ আর তুলসীদাস রূপে কলিযুগে রামচরিতমানস রচনা করেন ǀ দুটি রচনার মুখ্য উদ্দেশ্য শ্রী রামের জীবন ও গুণ গাথা ǀ অহল্যার উল্লেখ সেগুলিতে অতি সামান্য ǀ
4
মৎস্য পুরাণে একটা ইন্টারেস্টিং গল্প বলা আছে ǀ প্রজাপতি ব্রহ্মা মাতা সরস্বতীর সৃষ্টি করে নিজেই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন ǀ স্রষ্টা নিজেই নিজের সৃষ্টির প্রতি হয়ে পড়লেন আকৃষ্ট ǀ ব্রহ্মার দৃষ্টি এড়াতে মাতা গেলেন তার ডান দিকে ǀ সাথে সাথে ব্রহ্মার ডান দিকে প্রকট হলো একটি অতিরিক্ত মস্তক যাতে সরস্বতীর অনিন্দ্য রূপ তার দৃষ্টির আড়াল না হয় ǀ এর পর সরস্বতী ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করে প্রথমে গেলেন ব্রহ্মার পিছনে আর তার পর বাম দিকে ǀ সেদিকেও এক একটা মুখ প্রকট হলো ǀ সরস্বতী নিজেকে তুলে নিয়ে গেলেন আকাশের দিকে.. আরও একটা মুখ সৃষ্টি হলো মস্তকের উপর ভাগে ǀ শোনা যায় সরস্বতী ব্রহ্মার দৃষ্টি থেকে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন বহু কাল ǀ স্বয়ম সৃষ্টিকর্তা অকর্ষিত হবেন, এটা বোধ হয় তাঁর মনঃপুত ছিল না ǀ পরিশেষে তাঁর বিরহে ব্রহ্মার শোচনীয় পরিনাম দেখে, সৃষ্টির ধারা অব্যাহত রাখা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করে স্বামীরূপে গ্রহণ করেছিলেন ব্রহ্মা প্রজাপতিকে ǀ
ধন দৌলতের রক্ষক পরিবেশক যক্ষ স্বয়ম ǀ আবণ্টিত ধনরাশি লক্ষ্মী সমান ǀ লৌকিকতা অনুসারে আমরা অগ্নিকে আহ্বান করি লক্ষ্মীলাভের জন্যে যদিও আদতে তিনি বিষ্ণুপত্নী ǀ একথা অবশ্য বলা হয় যে শ্রী নারায়ণের শ্রেষ্ঠা ভক্তা জলন্ধর-পত্নী বৃন্দার অভিশাপে স্বয়ম ভগবান পর্যন্ত মেনে নিয়েছিলেন নিজের পত্নীকে বার বার হারাবার আর নিজে শালিগ্রাম শিলায় রূপান্তরিত হবার নিদান ǀ সে হিসেবে দেবী সুলভ দাক্ষিণ্যের বরপ্রাপ্তিস্বরূপ লক্ষ্মীলাভ কোনো পাপ কর্ম বলে গণ্য হয় না ǀ
তবে কি অহল্যার দণ্ডলাভ মাত্রাতিরিক্ত হয়েছিলো বলে মনে হয়? এ কথা ভুললে চলবে না যে অযোনিসম্ভাবা চির যৌবনা পৃথিবীশ্রেষ্ঠা সুন্দরী অহল্যা কোনো সাধারণ মানবী ছিলেন না ǀ সর্বোচ্চ দেবসত্তা ত্রিমূর্তির অন্যতম সদস্য সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার সৃজন হিসেবে তার মধ্যে দেবীত্বের ভাগ কম কিছু ছিল না ǀ শিব পুত্রী মা মনসা রীতিমতো সংঘর্ষ করে দেবীত্ব প্রাপ্তি লাভ করেছিলেন ǀ সেই হিসেবে অহল্যা মন্দোদরী সীতা - এরা কেউই কোনো দিন দেবীত্বের দাবি করেন নি, অথচ লোকমুখে অমর হয়ে রয়েছেন চিরটা কাল ǀ মা সীতা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করতেও প্রস্তুত ছিলেন আর অহল্যা পাষাণী অপবাদ শিরোধার্য করে নিয়েছিলেন বিনা প্রতিবাদে, অথবা হাজার বছরের নীরব প্রতিবাদে ǀ এটা সেই এক ধরণের সর্বংসহা ভারতীয় নারীর প্রতিচ্ছবি ǀ পুরুষের সাথে সমানভাবে চলতে সক্ষম আজকের নারী বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন, স্বয়ম্সম্পুর্ন, মানবাধিকারের সম্যতার বিষয়ে স্পষ্টবাদী ǀ বিপরীত দিকে সে যুগের নারীকুল সহজাত কোমল স্বভাবের কারণ স্ত্রীত্ব, সুশীলতা, সুকৃতি, বিশুদ্ধতা, উদারতা ইত্যাদির বিষয়ে জোর দিতেন বেশি ǀ একধরণের নৈসর্গিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে নারীর ওপর নানান বিধি নিষেধ চাপিয়ে দেওয়া চলতো ǀ
ইন্দ্র অন্ধ হয়েছিলেন অহল্যার প্রেমে, প্রথম দর্শনেই ǀ তার ওপর আবার যখন ব্রহ্মা ঘোষণা করলেন যে মহানুভব সর্ব্ব প্রথম পৃথিবী পরিক্রমা করে তার সামনে উপস্থিত হ'তে পারবে, অহল্যা তারই হবে, খুব উৎসাহ নিয়ে আশায় বুক বেঁধে বেরিয়ে পড়েছিলে রূপসী অহল্যার হৃদয় লাভের উদ্দেশ্যে ǀ কিন্তূ সৃষ্টিকর্তার মনে সেদিন অন্য কোনো বিশেষ অভিপ্রায় ছিল বলে মনে হয়... তাই মহর্ষি যখন কামধেনুর জন্ম প্রত্যক্ষ আর প্রদক্ষিণ করে ফিরে এলেন, ব্রহ্মাও সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা করে দিলেন যে গাভীর প্রসব দর্শন ও প্রদক্ষিণ পৃথিবী পরিক্রমার সমান ǀ তাই সর্ব্ব প্রথম ফিরে আসা গৌতমই অহল্যার উপযুক্ত পাণি প্রার্থী ǀ সেদিন বাস্তবের কঠোরতা মনে অনুভব করে বঞ্ছিত ও বর্জিত মনোভাব সংগোপনে লুকিয়ে সভা কক্ষ ত্যাগ করেও মন থেকে মেনে নিতে পারেন নি দেবরাজ ǀ ব্যাস, এর পরেই শুরু হয়ে যায় তার গুপ্তভাবে অহল্যার গতিবিধির অনুসরণ, প্রণয় নিবেদনের একটি মাত্র সুযোগের অপেক্ষা, বৈধ সম্পর্ক যদি ইহ জীবনে সম্ভব না হলো তবে অবৈধই সই ǀ শ্রীরাম চন্দ্রের গুনকীর্তন ছাড়া অন্য কোনো অন্তর্নিহিত বার্তা এই কাহিনীর মধ্যে আছে কিনা সেটা একটু ভিন্ন দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে দেখাটা খুব একটা অযৌক্তিক হবে বলে মনে হয় না ǀ
5
সমস্ত উপাখ্যানের সূচনা হয়ে থাকে কোথাও না কোথাও... এই কাহিনীর সূত্রপাতও অতীতের কিছু ঘটনা পরম্পরার ধারাবাহিকতায় ǀ চৌষট্টি কলায় পারদর্শিনী লাস্যময়ী অপ্সরা কুল শ্রেষ্ঠা রম্ভার আত্মগর্ব খর্ব করার উদ্দেশ্যে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা জল থেকে সৃষ্টি করলেন এমন একটি কন্যা যার বয়েস অষ্টাদশের বেশি কখনোই হবে না আর যার রূপের তুলনা ত্রিভুবনে দ্বিতীয়টি পাওয়া অসম্ভব হবে ǀ অতঃপর যথাযথ তত্ত্বাবধান সহকারে দেবকন্যাসম রূপসী বালিকাটির বয়ঃসন্ধিপ্রাপ্তি পর্যন্ত একটি উপযুক্ত অভিভাবকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে বিশ্বাসভাজন কোনো এক ব্যাক্তিত্ত্বের সন্ধানে রইলেন প্রজাপতি ǀ
এদিকে ব্রহ্মশৈল পর্বতে আশ্রমের ঋষিসমাজে বেদজ্ঞ শিব উপাসক ঋষি গৌতম ন্যায় শাস্ত্রের উদ্ভাবনা ঘটিয়ে নানান ধরণের মানব কল্যান মূলক সৎকাজ সম্পন্ন করে এক ধরণের দর্শনিক সুলভ প্রজ্ঞায় উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো দীপ্তির সাথে হিংসুটে ঋষিদের বিদ্বেষ বিতৃষ্ণার কারণ হয়ে উঠছিলেন ক্রমাগত ǀ এর পর আবার তিনি বহু বছর ধরে মহাদেবের তপস্যা করে এমন এক দৃষ্টান্ত নিয়ে আসলেন যে জ্বলন্ত আগুনে পড়লো ঘি ǀ দেবাদিদেব মহাদেব তুষ্ট হয়ে সশরীরে আবির্ভূত হলেন এবং দেবতাদেরও ধারণাতীত বর প্রার্থনা করতে আজ্ঞা দিলেন ǀ এ অবস্থায় মানুষের আনন্দে নৃত্য করারই কথা ǀ কিন্তূ খুবই অপ্রত্যাশিত ভাবে দেব গন্ধর্ব মানব যক্ষ - সবাইকে হতবাক করে দিয়ে স্থবির মানুষটি চেয়ে বসলেন শিবের জটা থেকে গঙ্গার একটি শাখার মুক্তি যার পুণ্য সলিলে মর্ত্যবাসী হয়ে উঠবে পাপ মুক্ত ǀ আসলে সেকালের কৃষিকাজ ও পশুশিকারে নির্ভর সভ্যতায় জলের গুরুত্ত্ব ছিল অপরিসীম ǀ মহাপ্রাণ গৌতম সেদিন মর্তবাসীর চাষাবাদের সুবিধের জন্যে পবিত্র গঙ্গাজলই চেয়ে বসলেন ǀ দেবতারা দিলেন সাধুবাদ আর ওদিকে আশ্রমের ঋষি সম্প্রদায় জ্বলতে লাগলেন ঈর্ষায় ! শোনা যায় যে আশ্রমের ঋষি সম্প্রদায় একজোট হয়ে উপাসনায় বাবা গণেশের তুষ্টি সাধন করে গৌতমের সম্মানচ্যুতির কামনায় বর প্রার্থনা করেছিলেন পর্যন্ত ! পার্বতীপুত্র প্রাথমিকভাবে এরকম নীচ গর্হিত কাজে সহযোগিতা করতে প্রত্যাখ্যান করেও পরে কিছুটা সহায়তা করেওছিলেন ঋষিকুলের ǀ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে নিজ তপস্যার গুণ ও উৎকর্ষতায় গৌতম মুনি সপ্তর্ষি পদ মর্যাদায় উন্নীত হয়েছিলেন নিতান্তই অনায়াসে যেখানে বিশ্বামিত্রের মতো মহা ঋষিকেও হাজার বৎসরের তপস্যা করতে হয়েছিল অন্তত বার দুয়েক ǀ
6
শিবের জটায় গঙ্গার দুটি শাখা ǀ বাবা মহাদেবের আশীর্বাদে তার প্রথম শাখাটি মর্ত্যে নিয়ে আসেন গৌতম ǀ অন্য শাখাটির মুক্তি সাধন করেছিলেন ভগীরথ, তাই গঙ্গার আরেক নাম ভাগীরথী ǀ সর্বক্ষণ বিভিন্ন রকমের নতুন নতুন তত্ত্বের মনন ও ধ্যানে গৌতম এমনই আবিষ্ট থাকতেন যে চলার পথে অতি অল্প বাধাতেই হোঁচট খেয়ে যেখানে সেখানে পড়ে গিয়ে আঘাত পেতেন এই প্রবীণ মানুষটি ǀ সমস্যাটির সমাধান করতে দেবতারা তার পা দুটিতে দৃষ্টি দান করে দিয়েছিলেন যাতে চলতে ফিরতে মানুষটির কোনও অসুবিধা না হয়, স্থূলভাবে বলতে গেলে সেটা আধুনিক কালের মোটরযানে ব্যবহৃত প্রতিবন্ধক সেন্সরের মতো কোনো গ্যাজেট ছিল নিশ্চই ! এটা অবশ্য লোক কথা থেকে পাওয়া গল্প ǀ অন্য জায়গায় এও বলা হয়েছে গৌতম-রচিত ন্যায়শাস্ত্র পাঠ করে, মহাভারতের রচয়িতা বেদব্যাস গ্রন্থটির কিছু ত্রুটি বের করে ফেলেন ǀ এর ফলে ক্রুদ্ধ গৌতম ঘোষণা করলেন তিনি চক্ষুদ্বারা ব্যাসদেবের মুখ দর্শন পর্যন্ত করবেন না যদিও পরে ব্যাসের অনুরোধে তাঁর মুখদর্শন করতে চান ǀ কিন্তু প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হবে,- এই বিবেচনায় গৌতম পায়ে চোখ স্থাপন করে ব্যাসদেবের মুখদর্শন করেছিলেন ǀ সেই থেকে গৌতমের আর একটি নাম অক্ষপাদ ǀ ব্রহ্মা যে এই মহানুভবকে রূপসী বালিকার রক্ষনাবেক্ষণের জন্যে মনোনীত করবেন তাতে আর অবাক হবার কি আছে ǀ
অতঃপর গৌতম মুনির আশ্রমে বড় হতে লাগলেন ব্রহ্মার মানসপুত্রী অহল্যা ǀ এই সময়েই তার শুদ্ধ চারিত্রিক লক্ষণ মুগ্দ্ধ করেছিল ঋষি গৌতমকে - কিন্তূ তখন কি আর তিনি জানতেন যে এই নাবালিকাই একদিন তপোসঙ্গীনি হয়ে তারই জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠবে!
7
সাধারণ ভাবে যে গল্পটা আমরা দেখতে পাই সেটা খানিকটা এই রকম - ঋষি গৌতমের অনুপস্থিতিতে গৌতমেরই বেশ ধারণ করে ইন্দ্র ছলনার আশ্রয়ে অহল্যাকে মোহাবিষ্ট করে তাকে নীতিভ্রষ্ট করেছিলেন ǀ এই অবস্থায় গৌতম মুনি হঠাৎই এসে পড়ায় তাদের অপরাধ রত অবস্থান তার নজরে আসে ǀ ইন্দ্র বেড়ালের রূপ ধারণ করে পলায়নে উদ্যত দেখে ক্রোধের আগুনে জ্বলে উঠে সিদ্ধবাক মুনি ইন্দ্রকে দিলেন সহস্রযোনির অভিসম্পাত ǀ এর পর অহল্যাকে পাথরে রূপান্তর হয়ে যাবার যে শাপটি দিয়েছিলেন সেটা ছিলো খুবই ভয়ঙ্কর ǀ এর প্রকৃত অর্থ হলো যে অনির্দিষ্ট কাল ধরে সাধারণ দৃষ্টির অগোচর হয়েই কাটাতে হবে তাকে ǀ কেউই তাকে দেখতে বা শুনতে পাবে না ǀ এ এক ধরণের যাবজ্জীবন নির্বাসন আপাতদৃষ্টিতে সমাজে বসবাস করা সত্ত্বেও ǀ পরে গৌতম নিজের ভুল অনুভব করে অহল্যার দণ্ড শীঘ্র অবসান হবার পন্থা হিসেবে জানালেন যে ত্রেতা যুগে স্বয়ম শ্রী বিষ্ণুর অবতার শ্রী রামের পদ স্পর্শে এই দশা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব ǀ শুধু তাই নয়, সেই মুহুর্ত্তে তপোবলে কাল চক্রটি ঘুরিয়ে তিনি সত্য যুগের অবসান ঘটিয়ে ত্রেতা যুগের সূচনাও করিয়ে দিলেন এ দশা থেকে দ্রুত মুক্তিলাভের উদ্দ্যেশে আর কঠোর তপস্যা করার সংকল্প নিয়ে আশ্রম ত্যাগ করে পাড়ি দিলেন হিমালয়ে, একরকম স্ব আরোপিত স্বেচ্ছা নির্বাসনের একান্ত নির্জনতায় ǀ
এর পর কয়েক হাজার বছর কেটে যায় শূন্য হয়ে যাওয়া আশ্রমের নিশ্চুপ একাকীত্ত্বের অন্ধকারে ǀ ইক্ষ্বাকু বংশীয় তরুণ রাজকুমার শ্রী রাম এক তুখোড় তীরন্দাজির প্রদর্শন করে দুই মহাবলী রাক্ষস মারীচ আর সুবাহুর উপদ্রব থেকে ঋষি বিশ্বামিত্রের আশ্রমটিকে সুরক্ষা প্রদান করে রওয়ানা দিলেন মা সীতার স্বয়ম্বর সভায় উপস্থিত হবার জন্যে ǀ পথ মধ্যে কমলাক্ষ বিস্তৃত বক্ষ দয়ালু রাজকুমার পায়ের ছোয়া দিয়ে অহল্যাকে মুক্তি দান করতে যখন পৌঁছলেন, তখন তার রূপচ্ছটা দ্যাখার মতো ǀ হাজার বছরের তপস্যার ফল আর চির যৌবনার সুন্দরতা দুটি মিলে মিশে মেঘে ঢাকা সূর্যের মতো দ্যাখা যাচ্ছিলেন অহল্যা তখন ǀ সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদের অন্তর্দ্বন্দ্বকে ধুয়ে মুছে ফেলে ততদিনে সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন তিনি ǀ পরিত্যক্ত আশ্রমে রঘুনন্দনের পদার্পনের খবর পেয়ে ছুটে এলেন গৌতম সে কোন যুগে হারিয়ে যাওয়া জীবনসঙ্গিনীটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে ǀ
মোটামুটি ভাবে এটুকু আমরা সবাই জানি ǀ এর থেকে বেশি তথ্য তুলে আনতে গেলে আঞ্চলিক লোক কথার দ্বারস্থ হতে হয়, যেগুলোর অধিকাংশেরই মূল কাহিনী থেকে অনেকটা সরে আসার সম্ভাবনাটা খুবই প্রবল ǀ তবে কিছু কিছু লোক কথা সত্যের আধারেও বিস্তার হয়ে থাকে ǀ উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি নিম্ন গাঙ্গেয় সমতলে প্রচলিত আসান বিবী, ওলা বিবীর পুজোর কথা যেটা একধরণের লোক আচার আর শুধুমাত্র মহিলা সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ǀ এই পুজোর উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে প্রাক বৈদিক অনার্য ভারতে প্রচলিত সপ্ত মাতৃকা পূজায় ǀ সপ্ত মাতার প্রতিমূর্তি সুদূর সিন্ধু উপত্যকায় ব্যবহৃত শিলমোহরএ দ্যাখা গেছে ǀ
8
সেরকমই ওড়িশি লোক কথা অনুসারে গৌতম অহল্যার তিন সন্তান ǀ প্রথমটি কন্যা – অঞ্জনী ǀ হ্যা, ইনিই অঞ্জনী পুত্র হনুমানের জন্মদাত্রী মাতা ǀ শিব ভক্ত গৌতমের যোগ্য সন্তান হিসেবে খুব অল্প বয়েসেই অঞ্জনী শিবের উপাসনায় নিযুক্ত হন ǀ পরবর্তী কালে শিবের আশীর্বাদে পবনের সহায়তায় হনুমানের ভ্রুণটি অঞ্জনীর যোগ্য গর্ভে স্থাপন করা হয়েছিল ǀ এছাড়া গৌতম অহল্যার দুটি পুত্র সন্তানও ছিল ǀ তার মধ্যে একটি ইন্দ্রপুত্র ǀ অন্যটি সূর্যপুত্র ǀ এই নিয়ে ওড়িশি লোককথায় একটা গল্প বলা হয়েছে ǀ একবার গৌতম দুই পুত্রকে কোলে নিয়ে নদীতে স্নান করতে যান ǀ দুই বালক শিশু যখন নদীতে স্নানে রত, এই সময়ে তাদের জন্ম রহস্য গৌতমের গোচরে এসে যায় ǀ বেদনাগ্রস্ত গৌতম পুত্রদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'যদি তোমরা আমার সন্তান হও, তবে আমার কোলে এস ǀ যদি আমার সন্তান না হও, তবে এখনই তোমরা বানর শিশুতে পরিণত হবে আর নদীর জলে ভেসে যাবে ǀ' আর হলোও ঠিক তাই ǀ দুই ভাই বানরে পরিণত হয়ে গেলো ǀ এরাই পরবর্ত্তীকালের বালি আর সুগ্রীব, যারা একে অপরের শত্রু হয়ে দাঁড়ান ǀ অঞ্জনীর সন্তান হিসেবে হনূমান হলেন এদের ভাগিনেয় ǀ কিষ্কিন্ধার জঙ্গলে হনুমান উদ্দেশ্য বিহীন ভাবে ঘুরে বেড়ানো স্ত্রীহারা শ্রীরামকে প্রথম দর্শনে চিনতে পারেন নি ǀ তাই ব্রাহ্মণের বেশে এসে প্রথমে যাঁচিয়ে নিতে চাইলেন রাঘব ভ্রাতৃদ্বয়ের আগমন সুগ্রীব রাজত্ত্বের পক্ষে হানিকারক নয় তো ? পরে একে অপরকে চিনতে পেরে আনন্দে বুকে জড়িয়ে ধরলেন ǀ শ্রী রামের বাল্যকালে শিব উপহার হিসেবে একটি বানর শিশু পাঠিয়েছিলেন ǀ সেটি আর কেউ না, স্বয়ম হনূমান ǀ মহাদেব চেয়ে পাঠিয়েছেন জেনে অঞ্জনী আনন্দের সাথে হনুমানকে যেতে দেন ǀ এর পরে রাম যখন গুরুকুলে চলে যান, হনূমান নিজের জায়গায় ফিরে আসেন ǀ এটাও একটা লোকমুখে পাওয়া গল্প ǀ এক যুগ পরে কিষ্কিন্ধায় আবার দেখা হয়ে দুজনের আনন্দ ব্যাখ্যারও অতীত ছিল ǀ আজকের দিনে মূল রামায়ণ, রামচরিতমানস ছাড়াও রামায়ণের আরো অন্তত তিনশো টি সংস্করণ দ্যাখা গেছে দেশে, দেশের বাইরেও ǀ এর মধ্যে তামিল রামাবতারম, তেলেগু শ্রী রঙ্গনাথ রামায়ণম, কৃত্তিবাসের শ্রী রাম পাঁচালী ইত্যাদি ছাড়াও অনামী রচয়িতার লেখা আনন্দ রামায়ণের বিশিষ্টতা বেশ উল্লেখযোগ্য ǀ
8
অহল্যা চরিত্র লিখতে বসে যে টুকু বললাম সেগুলোর মধ্যে নতুনত্ব কিছুই নেই ǀ তবে যে কথাটা বলতে চেয়েছি যুক্তিবাদী সজ্জন মানুষ সেটা প্রশ্রয় সহকারে বিবেচনা করবেন এটুকু আশা রাখি ǀ সন্ত তুলসীদাসের একটি চমৎকার ব্যাখ্যা টেনে এনে বলা যায় যে সজ্জন মানুষ দিব্যস্বরূপ চলতি ফিরতি তীর্থ বিশেষ, যাদের অনুগ্রহ লাভ কুম্ভস্নানের সমান ফলদায়ক - 'মজ্জন ফল পেখিয় তৎকালা, কাক হোহি পীক বকউ মরালা' ǀ শুধু একটাই ধন্দ মনের ভেতরটা এলোমেলো করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট ǀ সাধু সন্ত, দেব দেবীদের উপহাস কিংবা অবমাননা বিচক্ষণতার পরিচয় নয় ǀ খল চরিত্র জগতের ভালোটা দেখতে পায় না - 'হরি হর যশ রাকেস রাহু সে', অর্থাৎ শিব-বিষ্ণুর মাহাত্ত্ব অস্বীকার করে রাহুর চন্দ্রগ্রহণের প্রচেষ্টার মতো ǀ এ লেখায় যদি তা হয়েও থাকে তো সজ্জনের অনুকম্পা ও আনুকূল্যের বিশুদ্ধিলেপ প্রাপ্ত হয়ে সেটা দোষরহিত হয়ে দাঁড়াবে এটাই বিশ্বাস ǀ তবে মনের কিছু ইচ্ছে প্রত্যাখ্যান করা প্রায় অসম্ভব লাগে ǀ এই আখ্যানের এক একটি চরিত্র এতো বেশি পার্থিব যে একটা কল্পনা রঞ্জিত মানুষিক ভাবান্তরের লোভ সম্বরণ করা বেশ কঠিন ǀ দেব দানব গন্ধর্ব মানব - সবার প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করে কখনো এ কাজে শরিক হয়ে পড়বো আশা আছে ǀ...
আমার কথা টি ফুরোলো..... এবার তোমাদের মন্তব্য যদি পাই তো আনন্দ হবে সীমাহীন l
Comments
Post a Comment
Thank you, Stay connected & subscribe to this blog...